যে যাইই বলুক না কেন,ধূমপান মানুষের শুধু মাত্র আর্থিক ক্ষতিই করে না, সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করে হল চরিত্রের। মিথ্যা যেমন সকল পাপের মা,ঠিক তেমনি ধূমপান হল সকল প্রকার চারিত্রিক অবক্ষয়ের মা। আধুনিক আলেম-গন কোন কিছু না পড়েই ধূমপানের ব্যাপারে বিভিন্ন প্রকার কথা বলে থাকেন। কেউ বলেন মকরুহ, আবার কেউ বলেন মকরুহ তাহরিমী। এর পিছনেও একটা কারণ আছে। তাহলো যখন আলেমকে প্রশ্ন করে যে,“হুজুর আমি তো তামাক পাতা পুড়িয়ে তার ধুয়া পান করি, যারা তামাক পাতা সরাসরি খায়, তাদের জন্য বিধান কি”? তখন হুজুর সাহেব বিপদে পরে যান। কারণ হল তিনি নিজেই পান খান এবং সেই সাথে তামাকের পরিবর্তিত রূপ অর্থাৎ জর্দা খান। তাই সঠিক কথাটি বললে তিনি নিজেও বিধান থেকে বাঁচতে পারেন না।
বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে,কোন অধূমপায়ী ব্যক্তি যদি ধূমপায়ী ব্যক্তির কাছে অবস্থান করে,তাহলে এমনিতেই এক সপ্তমাংশ সিগারেটের নিকোটিন অধূমপায়ীর শরীরে প্রবেশ করে। তাছাড়া ধূমপানের গন্ধ অধূমপায়ীর জন্য সর্বাবস্থায় অসহনীয় বটে। আসলে ধূমপান সম্পূর্ণরূপে হারাম। ধূমপান হারাম হওয়ার কারণে কোন মহিলা যদি তার স্বামীকে ধূমপান ত্যাগ করতে বলে, এবং স্বামী যদি তা ত্যাগ না করে, তাহলে সেই মহিলা যে কোন সময় তার স্বামীকে ডিভোর্স করতে পারে। এটা তার ধর্মীয় অধিকার।
ভারত উপমহাদেশের জন্য পান একটি বিশেষ আপ্যায়নের সামগ্রী। পানের বিষয়ে বেশি আলোচনা কোথাও না হওয়ার পিছনে কারণ একটাই,তাহলো পান ভারত উপমহাদেশের বেশিরভাগ আলেম সম্প্রদায়ের মানুষই খেয়ে থাকে। একটু গভীর চিন্তা করে আমরা দেখতে পাই যে,গাছের কাণ্ড ও পাতা খায় চতুষ্পদ প্রাণী,আর ফল খায় মানুষ। তবে কিছু কিছু কাণ্ড ও পাতা আছে,যা পশু ও মানুষ উভয়েই খায়; কিন্তু সেই ক্ষেত্রে মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য হল,মানুষ খায় সেদ্ধ করে, আর পশু খায় সরাসরি বা কাঁচা। সেই সকল পাতা বা কাণ্ড মানুষের জন্য কাঁচা ভক্ষণ প্রায়ই ক্ষতিকর হলেও পশুর জন্য তা অত্যন্ত কল্যাণকর। আর পান নামক কাঁচা পাতাটি নির্দ্বিধায় মানুষ খেয়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র তা-ই নয় বরং পানের সাথে জরদা নামক আরও একটি জঘন্য পদার্থ তারা খেয়ে যাচ্ছে। হাদিসের তথ্যে পাওয়া যায় যে,শুধু মাত্র একটি যুদ্ধে সৈনিক-গন তাদের ক্ষুধা নিবারণের জন্য কাঁচা পাতা খেয়েই জীবন বাঁচিয়েছিলেন। আমদের ভারত উপমহাদেশের কিছু বদ-অভ্যাস যুক্ত মানুষ নিয়মিত কোন ধরনের জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে লিপ্ত আছে?
পান সংক্রান্ত কোন তথ্য সাহাবী (রা:) গন খাওয়া তো দূরের কথা,কোন দিন কল্পনাও করেননি। আরবের কোন দেশে আজও কারও পক্ষে প্রকাশ্যে একটা পান খাওয়ার ক্ষমতা নেই। পান খাওয়ার বিধান ইসলামে বিন্দু মাত্রও থাকলে সেখানে কখনও মদের মত পানও প্রকাশ্যে খাওয়া নিষিদ্ধ থাকতো না। আমাদের এলাকার পান-খোর গন আরব দেশে অনেক সময় একটা পান ৬/৭ দিরহাম দিয়ে পর্যন্ত কিনে। প্রয়োজনে বাথরুমে যেয়ে পান খেয়ে বাহিরে বের হয়,যেমন হয় বাংলাদেশে ফেনসিডিল খাওয়ার বেলায়। এই কথা সবারই জানা যে,এমন কিছু লোক আছে, যারা পানের নেশায় এতই আসক্ত যে,তারা প্রয়োজনে ভাত এক বেলা কম খাবে, কিন্তু পান তাদের চাই-ই চাই।
পান খেলে মানুষের দাঁতের রঙ কুৎসিত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে তিনি মাত্র চার বার দাঁত বের করে হেসেছিলেন। আর সেই সময় সাহাবী (রা) দের মধ্যে যারা তাঁর হাসিমুখ অবস্থায় দাঁত দেখেছিলেন,তাঁরা নিজেদেরকে সৌভাগ্য-শীল মনে করতেন। যাহোক অনেকে আবার পানের সাথে পচা বা মজা সুপারি খায়,যার গন্ধ পায়খানার চেয়েও বেশি খারাপ। হয়তো পান খাওয়া ব্যক্তি নিয়মিত এই দুর্গন্ধ যুক্ত সামগ্রী খেয়ে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে গন্ধ উপলব্ধি করতে পারে না,কিন্তু যারা পান খায় না,তারা টের পায় যে গন্ধটি কত জঘন্য। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে,“তোমাদের মধ্যে কেহ যেন দুর্গন্ধ যুক্ত সামগ্রী (পিয়াজ,রশুন ইত্যাদি) খেয়ে মসজিদে প্রবেশ না করে,যতক্ষণ পর্যন্ত সে দুর্গন্ধ মুক্ত না হয় “। আর বর্তমানে কিছু নামাজি পান-সিগারেট খেয়ে মসজিদে প্রবেশ করার পর তাদের পাশে কেউ নামাজে দাঁড়ালে তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় যে গন্ধ বের হয়,তাতে পার্শ্ববর্তী ব্যক্তির নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তাই রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদেশ যে ব্যক্তি মানতে পারল না,তার জন্য মসজিদে যাওয়া ঠিক নয়,যদিও সে মাওলানা উপাধি ধারি আলেম হন।
আমার মনে পরে সম্ভবত ১৯৯৯ সনে পাকিস্তানের আনযার শাহ কাশ্মীরী যশোরে একটি ওয়াজ মাহফিলে বলেছিলেন যে,“পান হল একটি গাছের পাতা, আর কাঁচা পাতা খাওয়ার কথা ছাগলের। অথচ সেই কাঁচা পাতা মানুষের খাওয়ার কোন যুক্তি নেই। আর যদি সে দাড়িওয়ালা মানুষ হয়,তাহলে ছাগলের পেটের ভিতরে থেকে বের করা পাতা মুখ বন্ধ করে চিবানোর সময় ছাগলের দাড়ি যেভাবে নড়া-চড়া করতে থাকে,তারও সেভাবেই নড়া-চড়া করে”। বক্তৃতাটি উর্দু ভাষায় হওয়ার কারণে যে ব্যক্তি অনুবাদ করছিলেন,সে ব্যক্তি এই অংশটুকু বাদ রেখে অনুবাদ করেছিলেন। অতএব পান খাওয়া মোটেও কোন ভাল জিনিস নয়। তাই প্রত্যেকেরই ধুম পানের মত পান খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করা উচিৎ। ধুম পায়ী ব্যক্তি-গন তামাকের পাতা খায় পুড়িয়ে ধূয়া করে,আরা পান খাওয়া মানুষ খায় সরাসরি। আমি টেন্ডারের ভিত্তিতে ১৯০৭-০৮ সনে ফিনলে চা বাগানে তিন ট্রাক তামাকের পাতা সরবরাহ করেছিলাম। চা বাগানে তামাকের কি প্রয়োজন হয়,আমার এমন একটি কৌতুহল সৃষ্টি হলে তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা উত্তর দিয়েছিল যে, ”কিছু পোকা আছে,যেগুলো বিষে মরে না,সেগুলো তামাকের পাতা ভিজানো পানি দিয়ে নিধন করতে হয়”। তাহলে একবার চিন্তা করে দেখুন,বিষের চেয়ে অধিক শক্তিশালি বিষাক্ত হল তামাক পাতা। সেই তামাক পাতাই আমাদের অনেকে গুল হিসাবে সরাসরি ব্যবহার করে,আবার কেউ জর্দা হিসাবে পানের সাথে খেয়ে থাকে। অতএব মহাবিপদ থেকে সাবধান হন।
বি:দ্রা: দূঃখের বিষয় একটিই শত চেষ্টা
করেও আমার বাবা-মাকে পান খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারিনি ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন